বাড়িঅন্যান্যজৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস-পর্ব-৪

জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস-পর্ব-৪

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে জৈন্তিয়ার ক্ষমতাচ্যুত রাজা রাজেন্দ্র সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর ভাগিনেয় ও উত্তরাধিকারী নরেন্দ্র সিংহ প্রতীকীভাবে রাজা হন। তিনি তাঁর মামার মতো গৃহবন্দী ছিলেন না। তিনি তাঁর মাতাসহ জৈন্তিয়ার রাজবাড়ী অর্থাৎ ফতেহ খাঁ নির্মিত রাজবাড়ীতেই থাকতেন। ইংরেজ সরকার এই প্রতিকী রাজাকে আর ভাতা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাই তিনি খুবই আর্থিক কষ্টের মধ্যে পড়ে যান। তাঁর এই দৈন্যদশায় ব্যথিত হয়ে জৈন্তিয়ার প্রজারা নিজপাটে একটি বৈঠক আহ্বান করেন।

ঐ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, নিজপাটের প্রত্যেক হাটী বা গলিতে পালাক্রমে যে সপ্তাহিক হাট বসে তা এখন থেকে বসানো হবে রাজবাড়ীর প্রাঙ্গনে আর এই হাটের আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ দেওয়া হবে রাজাকে। রাজপরিবারকে প্রদত্ত এই মাশুলকে ‘দান’ বলা হতো। যদিও হাটের নিমিত্তে রাজপরিবারের ভূমি ব্যবহারের বিনিময়ে এই মাশুল প্রদান করা হতো তবুও তা ‘দান’ হিসেবেই পরিচিত ছিল।

যতদিন ধরে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীরা জৈন্তিয়ায় বসবাস করেছিলেন ততোদিন পর্যন্ত এই ‘দান’ দেওয়ার প্রথাও চালু ছিল। সম্ভবত নগদ অর্থেই এই দান দেওয়া হতো। তবে ‘জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস’ বইয়ের লেখক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ লিখেছেন যে, দান হিসেবে বাজারের জিনিসপত্রই দেওয়া হতো। ঐ লেখকের বর্ণনামতে, ক্ষমতাচ্যুত রাজা রাজেন্দ্র সিংহের সময়েই এই হাটটি চালু করা হয়েছিল।

রাজা গৃহবন্দী হওয়ার পর রাজপরিবারের সদস্যদের আর্থিক সংকট দূর করার জন্য রাজার দুই ভগ্নিপতি উখাট কুওর ও লংবর কুওর এই হাটটি চালু করার উদ্যোগ নেন। তারা পাহাড় ও সমতলের সকল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পরামর্শ নিয়ে রাজবাড়ীর বড় উঠানে এই সপ্তাহিক হাট বসানোর আয়োজন করেছিলেন। এই হাটটি জৈন্তাপুরী হাট বা নিজপাট বাজার নামে পরিচিত ছিল। এই হাট-বাজারের ‘দান’ দেওয়ার প্রথা শতাব্দীকালেরও অধিক সময় ধরে টিকেছিল।

জৈন্তিয়ার প্রতীকী রাজা নরেন্দ্র সিংহ ঐ অস্থায়ী হাটের ক্ষুদ্র আয় দিয়ে খুবই কষ্টে পরিবার চালাতেন। অবশেষে তাঁর এই দূরবস্থার কথা জেনে সিলেটের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার মিস্টার লমটন জনসন সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলেন। মিস্টার লমটন জনসন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সিলেটের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন। রবার্ট লিন্ডসের সময়কার ‘রেসিডেন্ট’ পদটিকে ঐ সময়ে বলা হতো ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং ইংরেজ আমলের শেষ পর্যন্ত তা এই নামেই স্থির ছিল।

ডেপুটি কমিশনার জনসন সাহেব নরেন্দ্র সিংহের দূরবস্থায় সহানুভূতিশীল হয়ে ভারতের ইংরেজ গভর্নর জেনারেলের কাছে বিষয়টি তোলে ধরেন এবং অনেক লেখালেখির পর তিনি এই নিভৃতচারী রাজার জন্য মাসিক তিনশত টাকার ভাতার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হন। নরেন্দ্র সিংহ আজীবন এই ভাতা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনি আরও কিছু বিশেষ সুবিধাও ভোগ করেছিলেন। নিজপাট থেকে সিলেট গমণের সময় তিনি দেহরক্ষী, পতাকাবাহী এবং কিছু অনুসঙ্গীও সাথে রাখতে পারতেন। অত্যন্ত সচ্চরিত্র, অমায়িক ও সাহসী মানুষ হওয়ায় তিনি সকলের কাছে বেশ সম্মান পেতেন। জৈন্তিয়ার বিভিন্ন বিনোদনমূলক উৎসবেও তাকে নিমন্ত্রণ করা হতো।

তৎকালীন সময়ে শিকার ছিল বিনোদনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ‘গড়’ এর ভেতর পশু আটকে শিকারের পদ্ধতিটি আমরা লিন্ডসের লেখায় পড়েছি। এটি বেশ একটি ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। বিশেষ করে বাঘ শিকারের বেলায় তা আরও বেশী ঝুঁকিপূর্ণ। নরেন্দ্র সিংহের দুর্ভাগ্য যে, তিনি এই ঝুঁকিপূর্ণ খেলা দেখতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে ফেলেছিলেন। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে বাঘ শিকার দেখার জন্য তিনি একটি বাঘের গড়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে তিনি দুর্ভাগ্যবশতঃ বাঘের আক্রমণের শিকার হন এবং গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

নরেন্দ্র সিংহ তাঁর দুটি নাবালক ভাগিনেয়কে লালন-পালন করতেন। এদের নাম ছিল- নরসিংহ নৃপ ও ছত্রসিংহ নৃপ। এদের পিতা-মাতা কেউই জীবিত ছিলেন না। তাই মামাই ছিলেন তাদের একমাত্র সহায় ও অবলম্বন। নরেন্দ্র সিংহের মৃত্যুতে তারা একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ে। একটি বিখ্যাত রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী এই শিশুদের এমন অসহায়ত্ব কিছু মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। এদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন সিলেট জেলার জজ বাহাদুর। তিনি এই শিশুদেরকে নিজপাট থেকে সিলেট শহরে নিয়ে যান এবং তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন।

সিলেটে তাদেরকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখায় ভর্তি করা হয়েছিল। পড়ালেখা শেষে বড় হয়ে তারা আবার ফিরে এসেছিলেন নিজেদের মাতৃভূমি জৈন্তিয়ায়। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে তারা নিজপাটের ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ীতে এসে বসবাস শুরু করেন। দুর্ভাগ্যবশত তাদের ফিরে আসার কিছুদিন পূর্বে এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে রাজবাড়ীটি খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ঐ ভূমিকম্পে বৃহত্তর সিলেট, মেঘালয়, কাছাড় এবং আসামের অধিকাংশ প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এসব অঞ্চলের প্রত্নসম্পদের এতোটা ক্ষয়ক্ষতি আর কোন ভূমিকম্পের ফলে হয়নি।

নরসিংহ নৃপ এবং ছত্রসিংহ নৃপ তাদের বাকী জীবন এই ভাঙ্গা রাজবাড়ীতেই কাটিয়েছিলেন। জৈন্তিয়াবাসীর কাছ থেকে তারাও রাজার সম্মান লাভ করেছিলেন। নরেন্দ্র সিংহের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে জৈন্তিয়াবাসী নরসিংহকে রাজা হিসেবে সম্মান করত। তাঁর মৃত্যুর পর ছত্রসিংহকে রাজার সম্মান দেওয়া হয়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে নরসিংহের আকস্মিক মৃত্যুর পর ছত্রসিংহ জৈন্তিয়ার প্রতীকী রাজার মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

নরসিংহ নৃপ চিরকুমার ছিলেন। তাঁর কোন বংশধর নেই। অন্যদিকে ছত্রসিংহ নৃপ খুবই সাড়ম্বরে বিবাহ করেছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারে। ত্রিপুরার রাজপরিবারের নবদ্বীপ বাহাদুরের কন্যা তাঁর স্ত্রী হয়ে নিজপাটে এসেছিলেন। এই বিবাহে জৈন্তিয়াবাসী খুবই আনন্দ করেছিল। নরেন্দ্র সিংহ ও নরসিংহের মতো ছত্রসিংহও জৈন্তিয়াবাসীর কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল, সদালাপী ও নিরহংকারী প্রকৃতির মানুষ।

ছত্রসিংহ ইংরেজ সরকারের কাছ থেকেও কিছুটা আনুকূল্য পেয়েছিলেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার তাঁর জন্য মাসিক তিনশত টাকার ভাতা মঞ্জুর করে। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তা চারশত টাকায় উন্নীত হয়। ইংরেজদের কাছ থেকে তিনি আরও কিছুটা বদান্যতা পেয়েছিলেন। সিলেটের ইংরেজ কর্তৃপক্ষ তাকে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ভূম্যাধিকারীর সম্মান দিয়েছিল। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ জানুয়রি তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে ছত্রসিংহ যে ভাতা পেতেন তা দিয়ে রাজপরিবার চালানো তাঁর জন্য খুবই দূরুহ ছিল। জৈন্তাপুরী হাটের আয়ও খুবই সীমিত ছিল। এজন্য মৃত্যুর পূর্বে তিনি আর্থিকভাবে বেশ দায়গ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইংরেজ সরকার এসব ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে তাঁর সকল সম্পত্তির ভার গ্রহণ করেছিলেন। এসব সম্পত্তি ‘নৃপ ওয়ার্ড এস্টেট’ নামে কোর্ট অভ ওয়ার্ডের অধীনস্ত ছিল।

ছত্রসিংহের মৃত্যুর পর আর কেউ জৈন্তিয়ার প্রতীকী রাজার মর্যাদা লাভ করেননি। তবে তাঁর বংশধররা জৈন্তিয়াবাসীর কাছ থেকে যথেষ্ট সম্মান ও ভালবাসা পেয়েছিলেন। তাঁর কন্যাদের কথা আজও জৈন্তিয়ার প্রবীণদের মুখে শোনা যায়। তাঁর প্রথম ও তৃতীয় কন্যার বিয়ে হয়েছিল কাছাড়ের রাজপরিবারে। উল্লেখ্য যে, জৈন্তিয়ার মতো কাছাড়ের রাজপরিবারটিও ছিল ক্ষমতাচ্যুত। তখনকার সময়ে কাছাড় ছিল ইংরেজদের অধীনস্ত একটি জেলা।

কাছাড়ের প্রাক্তন রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা শিলচর শহরে বসবাস করতেন। সেখানকার এক উচ্চশিক্ষিত রাজকুমারের সাথে জৈন্তিয়ার রাজার জ্যোষ্ঠকন্যার বিবাহ হয়েছিল। ঐ রাজকুমারের নাম ছিল জন্মেজয় বর্মণ। রাজা ছত্রসিংহের দ্বিতীয় কন্যার নাম ছিল মলীনা দেবী। তাঁর বিবাহ হয়েছিল রংপুরের আরেক উচ্চশিক্ষিত যুবকের সাথে। ঐ যুবকের নাম ছিল বিনয়ভূষণ রায়। তাঁর বাড়ী ছিল রংপুর গ্রামের পাটীকা পাড়া গ্রামে।

রাজা ছত্রসিংহের তৃতীয় কন্যা ছিলেন ইরা দেবী। এই রাজকন্যার বিবাহ অনুষ্ঠানে জৈন্তিয়াবাসী বেশ আনন্দ করেছিল। এই বিবাহে রাজা ছত্রসিংহ পাহাড় ও সমতলের সকল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২১ মাঘ তারিখে এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিবাহের দিন জৈন্তিয়ার রাজবাড়ীতে পাহাড় ও সমতলের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ইরা দেবীর বর ছিলেন জন্মেজয় বর্মণ। জন্মেজয় বর্মণের প্রথম স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যু হওয়ায় ইরা দেবীর সঙ্গে তাঁর পুনরায় বিবাহ নির্ধারিত হয়েছিল। জন্মেজয় বর্মণ আসাম সিভিল সার্ভিসে চাকরি করতেন। তিনি ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। কর্মজীবন শেষে তিনি সপরিবারে শিলং শহরে বসবাস করতেন বলে জানা যায়। ইরা দেবী তাঁর শেষ বয়সেও জৈন্তিয়ার রাজবাড়ীতে আসা-যাওয়া করতেন। এজন্য তাঁর কথা এখনও অনেকের মনে রয়েছে।

জৈন্তিয়ার শেষ প্রতীকী রাজা ছত্রসিংহ মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সকল সম্পত্তি কনিষ্ঠ কন্যা ইরা দেবীর নামে উইল করে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে এসব সম্পত্তির ওপর ইরা দেবীর বংশধরদের আর কোন অধিকার অবশিষ্ঠ নেই। জৈন্তিয়ার রাজবাড়ী, রাজদরবার, বড় দেউল, টুপীর মঠসহ বিভিন্ন স্থাপনা এখন বাংলাদেশ সরকারের ‘জাদুঘর ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ’ এর অধীনে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমশ এসব মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই হয়তো এসব স্থাপনা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
লেখক : আসিফ আযহার

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments