বাড়িঅন্যান্যবৃষ্টিতে ভিজে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করল ৪ লাখ মুসল্লি

বৃষ্টিতে ভিজে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করল ৪ লাখ মুসল্লি

মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই শান্তিপূর্ণ ভাবে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলো কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহে। সকাল দশটায় জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে ৮টা থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি। তবুও শোলাকিয়া মাঠে ছিল মুসল্লিদের ঢল। বৃষ্টির প্রভাব বিন্দুমাত্রও পড়েনি ঈদ জামাতে। এবারের জামাতে চার লাখ মুসল্লিরও অধিক নামাজ আদায় করেছেন বলে ধারণা আয়োজকদের।

মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া ঈদুল ফিতরের ১৯৫ তম জামাতে ইমামতি করেন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজার শাহাবুদ্দিন মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা শোয়াইব বিন আব্দুল রউফ। নামাজ শেষে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। তখনো অঝোরে ঝরছিল বৃষ্টি।

আগের দিন থেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে মুসল্লিরা কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে প্রবেশ করতে থাকেন। কাক ডাকা ভোর হতেই হাজার হাজার মুসল্লির পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে ঈদগাহে প্রবেশের রাস্তাঘাট। কেউ গাড়িতে চড়ে কেউ বা পায়ে হেঁটে জামাতে অংশ নিতে আসেন। সকাল ৯টার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে শোলাকিয়া। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মুসল্লিরা মাঠে প্রবেশ করে জামাতে অংশ নেন।

বরাবরের মতো বহু মুসল্লি মাঠের আশপাশের প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছেন। মুসল্লিদের বিশ্বাস বেশি লোক একসঙ্গে নামাজ আদায় করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। তাই নানা ভোগান্তির পরও বিভিন্ন জেলা থেকে লাখো মুসল্লি শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করতে আসেন বহু বছর ধরেই।

নেত্রকোনা থেকে এসেছেন ছফির উদ্দিন। এবার নিয়ে পাঁচবার শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করেছেন। তিনি বলেন, প্রথমবার এ মাঠে নামাজ আদায় করে মনে একটা অন্যরকম শান্তি চলে আসে। রাতেই এখানে একটি আবাসিক হোটেলে এসে উঠেছিলাম। তারপর সকালে লাখো মুসল্লির সঙ্গে জামাতে অংশ নিয়েছি।

২০১৬ সালে ঈদের নামাজ চলাকালীন মাঠের কাছে পুলিশের নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গি হামলার পর থেকে শোলাকিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয় খুব গুরুত্বসহকারে। দুই বছর পর জামাত হওয়ায় এবারও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মাঠের ভেতরে দুটি ওয়াচ টাওয়ারে স্নাইপিং রাইফেল নিয়ে দায়িত্বপালন করেন র‍্যাব সদস্যরা। এ ছাড়া, আরও চারটি ওয়াচ টাওয়ারে ছিলেন পুলিশের সদস্য। মাঠের নজরদারিতে পুলিশের বেশ কয়েকটি ড্রোন ক্যামেরাও মোতায়েন ছিল। মোতায়েন ছিল মাইন সুইপিং ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল। পুরো মাঠ ও আশপাশের এলাকা ছিল সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ১ হাজার ৩ শত পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি, ৫ প্লাটুন বিজিবি ও সাদা পোশাকে বিপুল সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছিল মাঠের নিরাপত্তায়।

জামালপুর জেলার ৬৫ বছরে জয়নাল বলেন, আমি ১২ বছর বয়সে প্রথম বাবার সঙ্গে এ মাঠে ঈদের জামাতে এসেছিলাম। এবার আমি আমার ছেলে ও নাতিকে নিয়ে এসেছি। আমার নাতির বায়না ছিল এ মাঠে ঈদের জামাতে আসবে। কিন্তু গত দুই বছর করোনায় ঈদের জামাত না হওয়ায় আসতে পারেনি। তবে এবার বৃষ্টিতে ভিজে নামাজ পড়েও মনে একটা তৃপ্তি পেয়েছি, নাতি ও ছেলেকে নিয়ে একসঙ্গে অংশ নিয়ে।

শোলাকিয়া ঈদগাহের রেওয়াজ অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে শটগানের ৬টি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে ৩ টি, ৩ মিনিট আগে ২টি এবং ১ মিনিট আগে ১টি গুলি ছুড়ে নামাজ শুরুর সংকেত দেওয়া হয়।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ভোরেই পুরো মাঠ তল্লাশি করা হয়। শহরের যত অলিগলি আছে সবখানে আমাদের নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছিল। সব মিলিয়ে চার স্তরের নিরাপত্তা ছিল শোলাকিয়াকে ঘিরে। পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‍্যাব, আনসার সদস্যের সমন্বয়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের পাশাপাশি মাঠে সাদা পোশাকে নজরদারি করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। আমরা খুব সন্তুষ্ট এত বড় একটি জামাত নির্বিঘ্নে শেষ করতে পেরে।

ঈদের জামাতকে ঘিরে শহরের মোড়ে মোড়ে নির্মাণ করা হয় শুভেচ্ছা তোরণ। রাস্তার দুপাশে টাঙানো হয় নানা রঙের পতাকা ও ব্যানার। মুসল্লিদের সুবিধায় পুরো মাঠ ও আশপাশে খাবার পানির ব্যবস্থা রাখে পৌর কর্তৃপক্ষ। মাঠে তৎপর ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল টিম। স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করে স্কাউট সদস্যরা। সব মিলিয়ে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় মুখর ছিল গোটা শোলাকিয়া মাঠ। সকালে দুটি বিশেষ ট্রেনে ভৈরব ও ময়মনসিংহ থেকে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি কিশোরগঞ্জে আসেন।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, গত দুই বছর করোনা মহামারির কারণে শোলাকিয়ায় ঈদ জামাত হয়নি। তাতে সব মুসল্লিদের মনে একটি আক্ষেপ ছিল। আজকে লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে শোলাকিয়া মাঠ আবারও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সবার সার্বিক সহযোগিতায় সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে উপমহাদেশের একটি বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments