বাড়িঅন্যান্যমেয়ে সেজে ফেসবুকে প্রেম, মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা

মেয়ে সেজে ফেসবুকে প্রেম, মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা

মেয়ে সেজে ফেসবুকে প্রেম, মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা

সিলেটের গোয়াইনঘাটে ১২ ঘন্টার ব্যবধানে পৃথক স্থান থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেলে এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধারের ১২ ঘন্টা না পেরোতেই এবার মিলল হাত পা বাঁধা আরেক মাদ্রাসা শিক্ষকের লাশ। পৃথক এ দুটি খুনের ঘটনায় উপজেলা জুড়ে আতংক দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে উপজেলার জাফলং সীমান্ত এলাকা থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় কাওসার মিয়া নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের হাত পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। রাত পৌনে একটার দিকে জাফলং গুচ্ছগ্রামের সংগ্রাম বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন লালমাটি এলাকা থেকে ওই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত কাওসার মিয়া সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কালাম বহরপুর গ্রামের আব্দুল বাছিতের ছেলে। তিনি ব্রহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে একটি মাদ্রসায় শিক্ষকতা করতেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয়দের মাধ্যমে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ জানতে পারে জাফলংয়ের সংগ্রাম বিজিবি ক্যাম্পের প্রায় পাঁচশত গজ পূর্ব দিকে ভারত ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমা রেখার কাছে একটি টিলা সংলগ্ন জমিতে হাত পা বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে আছে। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক গোয়াইনঘাট সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার প্রবাস কুমার সিংহ, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে. এম. নজরুল ইসলাম ও গোয়াইনঘাট থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ওমর ফারুক মোড়ল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং নিহত ব্যাক্তির ব্যবহৃত মোবাইল উদ্ধার করে তার পরিচয় সনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সামসুল ইসলাম হাসান নামের একজনকে আটক করে থানা পুলিশ। এসময় তার কাছ থেকে একটি খেলনা পিস্তল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোগো সংবলিত চারটি এন্ড্রয়েট মোবাইল, একটি মাস্ক এবং একটি কম্পিউটারের মাদার বোর্ড উদ্ধার করে। আটক সামসুল ইসলাম চাপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দাদনচক মিয়াপাড়ার নজরুল ইসলামের ছেলে।
আটকের পর হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে সামসুল ইসলাম। বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার দুপুরে প্রেস ব্রিফিং করেছে গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ। তার জবানবন্দির বরাত দিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন (পিপিএম) জানান, ঘাতক সামসুল ইসলাম বিভিন্ন অপরাধ এবং প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। যার কারণে সে তার পরিবার থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সামসুল ইসলাম সময় সুযোগ বুঝে বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে একজন ফ্রি ল্যান্সার ও আইটি বিশেষজ্ঞ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিত।
গত ৬ থেকে ৭ মাস পূর্বে নিজেকে সামিয়া জাহান নামে পরিচয় দিয়ে ভূয়া একটি ফেইসবুক আইডি ব্যবহার করে মেয়ে সেজে মাদ্রাসা শিক্ষক কাওসার মিয়াকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সামসুল ইসলাম। এরপর থেকে তাদের মধ্যে ম্যাসেঞ্জারে বিভিন্ন সময় কথোপকথন হতো। এরই মধ্যে গত ৯ এপ্রিল সামসুল ইসলাম জাফলংয়ে এসে নিজেকে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে মামার বাজারে মেঘালয় নামে একটি আবাসিক হোটেলে উঠে। সেখানে অবস্থান নিয়ে সে গত বৃহস্পতিবার পহেলা বৈশাখে কাওসার মিয়াকে ফোন করে দেখা করার জন্য জাফলংয়ে আসতে বলে। প্রলোভনে পড়ে তার কথা মতো কাওসার মিয়া এদিন সন্ধ্যার দিকে জাফলংয়ে আসেন। ঠিকানা মতো হোটেলে গিয়ে দেখতে পান সেখানে সামিয়া জাহান নামে কেউ নেই বা কোন মেয়ের অস্তিত্ব নেই। আর হোটেল কক্ষে যিনি রয়েছেন তিনি একজন ছেলে মানুষ। তখন সে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে সেখান থেকে চলে যেতে চায়। আর ঠিক ওই মুহুর্তে প্রতারক সামসুল ইসলাম কাওসার মিয়াকে ফেইসবুকের বিভিন্ন এডিট করা ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল; করে। একই সঙ্গে নিজেকে একজন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা অফিসার পরিচয় দেয় এবং তার কাছে থাকা পিস্তল দিয়ে ভয় দেখিয়ে কাওসার মিয়ার কাছে নগদ দুই লাখ টাকা দাবী করে। যা দিতে অস্বীকৃতি জানায় মাদ্রাসা শিক্ষক কাওসার। আর দাবীকৃত টাকা না পেয়ে ঘাতক সামসুল ইসলাম সময় সুযোগ বুঝে রাত সাড়ে দশটার দিকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে হোটেল থেকে কাওসার মিয়ার দুই হাত বেঁধে গুচ্ছগ্রামের লালমাটি এলাকায় নিয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করে। এ ঘটনায় গোয়াইনঘাট থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন জানিয়েছেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) শাহরিয়ার বিন সালেহ, গোয়াইনঘাট সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার প্রবাস কুমার সিংহ, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে. এম. নজরুল ইসলাম ও পরিদর্শক (তদন্ত) ওমর ফারুক মোড়ল।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার সাকের পেকেরখাল গ্রামের একটি খাল থেকে মুক্তার হোসেন নামের অপর এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মুক্তার হোসেন উপজেলার ভিতরগুল গ্রামের কুটু মিয়ার ছেলে। ঘটনা তদন্তে এবং জড়িতদের আটকে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে. এম. নজরুল ইসলাম।
এদিকে হঠাৎ করে ১২ ঘন্টার ব্যবধানে গলাকাটা ও হাত-পা বাঁধা পৃথক দুটি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় উপজেলা জুড়ে আতংক দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার দাবি করেছেন সচেতন মহল।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments