বাড়িচট্টগ্রাম বিভাগচট্টগ্রাম জেলাস্কুলের সামনে নিয়ন্ত্রণহীন গরু, প্রাণ হারাল এক মেধাবী ছাত্রী

স্কুলের সামনে নিয়ন্ত্রণহীন গরু, প্রাণ হারাল এক মেধাবী ছাত্রী

মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)প্রতিনিধিঃ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে গেল এক কিশোরী জীবনের স্বপ্ন। বুধবার (১১ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়া এস. আই. চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের সামনে ঘটে যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা। এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত এক তরুণী শিক্ষার্থীর জীবন থেমে যায় এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায়, শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

নিহত ছাত্রী সারাবন তহুরা (১৫) লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদার পাড়ার সৌদি প্রবাসী মাহফুজুর রহমানের মেয়ে। তিনি পদুয়া এ. সি. এম উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখতেন উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। কিন্তু নির্মম বাস্তবতার আঘাতে সেই স্বপ্নগুলো এক মুহূর্তেই নিভে গেল।

প্রত্যক্ষদর্শী আমানুল্লাহ (২৮) ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জসিম উদ্দিন নামে এক গরুর ব্যবসায়ী পদুয়া তেওয়ারিহাট বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে একটি গরু নিয়ে আসেন। গাড়ি থেকে নামিয়ে গরুটিকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে গরুটি রশি ছিঁড়ে ছুটে যায়। সেই সময় কোচিং সেন্টারে যাওয়ার পথে থাকা সারাবন তহুরার পেছন দিক থেকে এসে গরুটি শিং দিয়ে আঘাত করে। আঘাতের তীব্রতায় সে গাছ ও পাশের একটি পাকা পিলারের সঙ্গে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা খায়। মুহূর্তের মধ্যেই তার নাক ও মুখ দিয়ে প্রচুর রক্তপাত শুরু হয়।

স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একটি সম্ভাবনাময় তরুণ জীবনের এভাবে নিভে যাওয়া মুহূর্তেই পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে প্রতি বুধবার ও রবিবার নিয়মিত গরুর হাট বসে। বিভিন্ন এলাকা থেকে গবাদিপশু এনে এই হাটে বিক্রি করা হয় এবং বাজারে আনা–নেওয়ার সময় প্রায়ই স্কুলসংলগ্ন সড়ক দিয়েই পশুগুলো পারাপার করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, গরু পরিবহনের সময় যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা কিংবা নির্দিষ্ট চলাচলপথ না থাকায় প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অনেক সময় গরু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে হঠাৎ দৌড়ে বা তেড়ে গিয়ে পথচারীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এলাকাবাসীর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়ে এভাবে গরু আনা–নেওয়া দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে স্কুল চলাকালীন সময়ে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। স্থানীয়রা দাবি করেন, বহুবার বিষয়টি নিয়ে কথা উঠলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, যথাযথ তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।

সারাবন তহুরার অকাল মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সে ছিল শান্ত স্বভাবের, বিনয়ী ও মেধাবী একজন ছাত্রী। সামনে এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে তার অনেক স্বপ্ন ছিল—নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার, পরিবারকে গর্বিত করার। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্নগুলো আজ থেমে গেল এক অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায়।

এলাকাবাসী নিহত শিক্ষার্থীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে স্কুল এলাকার সামনে দিয়ে গবাদিপশু আনা–নেওয়া নিয়ন্ত্রণসহ প্রশাসনের জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একটি তরতাজা প্রাণের বিনিময়ে যেন অন্তত নিরাপত্তা ও সচেতনতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments