

আবু সরকার ছিলেন সিলেট জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি। সদ্যই সাবেক হয়েছেন তিনি। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি এসেছে। দিলু মিয়া সভাপতি, আবদুল গফুর সাধারণ সম্পাদক। অন্য ইউনিয়নে সভাপতিরাই সর্বেসর্বা হলেও এ ইউনিয়নে ব্যতিক্রম।
শ্রমিকদের এ সংগঠনটিতে ছড়ি ঘুরাচ্ছেন সাধারণ সম্পাদকই। আবু সরকার যে ‘বাগান’ সাজিয়ে ছিলেন তাতে ফুল ফুটানোর দায়িত্ব যেনো এখন আবদুল গফুরের কাঁধেই। আবু সরকারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সদস্যভর্তি ও নবায়নের নামে পকেট ভারি করা, বালু-পাথর মহাল থেকে মাসোহারা আদায়ের অনেক রকম অভিযোগ ছিলো। একই রকম অভিযোগ জমছে টাঙ্গাইলের সন্তান আবদুল গফুরের বিরুদ্ধেও। মাত্র তিন মাস আগে দায়িত্বে এসেছেন আবদুল গফুর। অভিযোগের পাল্লাটা তাই আস্তে আস্তে ভারি হচ্ছে। শ্রমিকদের ক্ষোভ অসন্তোষও বাড়ছে ধীরে ধীরে।
পাঁচদিন হলো আমরা একে একে গল্প শুনিয়ে আসছি পরিবহন সেক্টরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। আবার একটু মনে করিয়ে দিই নামগুলো। সেলিম আহমদ ফলিক, রাধিকারঞ্জন দাস ওরফে আবু সরকার, মো. জাকারিয়া আহমদ, কাজী রুনু মিয়া মঈন, ময়নুল ইসলাম, জিয়াউল কবীর পলাশ, এবং আবদুল গফুর। তারা একেকজন একেকটি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কারিগর। নিজেদের সুবিধা অসুবিধা সামাল দেওয়ার কথা এসব নেতাদের নিজেদেরই। কিন্তু তারা এজন্য বলির পাঁঠা করছেন সিলেটের সাধারণ মানুষদের। ধর্মঘট নামের অস্ত্র দিয়ে ঘায়েল করছেন পথচলতি মানুষদের। শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন।
পথ চলতে পরিবহন শ্রমিকদের কখনও মালিকের সাথে বিরোধ হয়। কখনও পুলিশের সাথে ঝামেলা হয়। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনের সাথেও কখনও কখনও বিরোধ তৈরি হয়। আইনি ঝামেলা আইনি ভাবে মোকাবেলার পথ রয়েছে। মালিকের সাথে বিরোধ মিটতে পারে আলাপ-আলোচনায়। তবে পরিবহন শ্রমিক নেতারা সেসব পথে হাঁটেন না। বেছে নেন সবচেয়ে সহজ পথটি। সাধারণের পথ চলার অধিকারকে জিম্মি করে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করেন তারা। সাধারণের ভোগান্তিটাকে কীভাবে আরও বাড়িয়ে প্রশাসনকে কীভাবে আরও চাপে ফেলা যায় তার কৌশল খুঁজেন তারা। গঠন করেন ‘সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ’।
পথ যারা চলেন তারা কিন্তু একটি বাহনের উপর নির্ভরশীল নন। কেউ বাসের উপর নির্ভরশীল। কারো ভরসা সিএনজি অটোরিকশায়। কেউ স্বস্তি খুঁজে পান মাইক্রোবাসে। হিউম্যান হলার বা লেগুনায়ও পথ পাড়ি দেন অনেকে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে হলে থামিয়ে দিতে হবে সব গাড়ির চাকা। তাই বাসের সাথে ট্রাক, ট্রাকের সাথে সিএনজি অটোরিকশা, অটোরিকশার সাথে মাইক্রোবাস, মাইক্রোবাসের সাথে পিকআপের চাকাও বন্ধ করে দিতে হবে। তবেই বেকায়দায় ফেলা সম্ভব, বেকায়দায় ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। তাই ঐক্য হয় পরিবহন শ্রমিক নেতাদের। মোর্চা গঠন করেন তারা। যেকোনো ছোটখাট অজুহাতে সব চাকা বন্ধ করার শক্তি অর্জন করেন।
ফিটনেস বিহীন গাড়ি চালনা, লাইসেন্স না থাকা, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক না থাকা গাড়িতে কালো গ্লাসের ব্যবহারের কারণে বিধিবদ্ধ ভাবে মামলা হলেও তারা ধর্মঘটের ডাক দেন। এমনকি নিজেদের দ্বন্দ্বে মামলা হলেও অবরোধ ডাকেন। কারণ তাদের মুঠো জমা হয়েছে ‘ব্ল্যাকমেইলিং পাওয়ার’।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বিরুদ্ধে পরিবহন নেতাদের যে ক্ষোভ তার কারণ ওই কালো গ্লাসের সূত্র ধরেই। এছাড়া এসএমপির উপ কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদের অ্যাকশনেও খেপে ছিলেন শ্রমিক নেতারা।
বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফও কঠোর হন। তখন তার উপরও খেপে যান পরিবহন শ্রমিক নেতারা। তারা চান, চাপে ফেলে সড়কে অবাধ চলাচলের পারমিশন আদায় করে নিতে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চান যেনো কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে, মামলা দিতে না পারে। কারণ মামলাতেই যত ভয় শ্রমিক নেতাদের।
শ্রম আদালতে বেশ কিছু মামলা চলমান রয়েছে, এ নিয়ে এমনিতেই বেকায়দায় আছেন। আরও মামলা হলে আরও বেকায়দায় পড়তে হবে। নিজেদের বেকায়দায় পড়া চলবে না, তাই আটকে দিতে হবে পথ; বেকায়দায় ফেলতে হবে সাধারণ মানুষকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিনকে সামনে রেখে। যাতে বেকায়দায় ফেলা যায় প্রশাসনকে। তারা ধর্মঘটের জন্য বেছে নেন কোনো পরীক্ষার দিন। সর্বশেষ তারা যে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন, তখন সামনে ছিলো এসএসসি পরীক্ষা। আর কিছু না হোক, ‘জিম্মি’ করার মন্ত্রটা তারা ভালোই জানেন।
সূত্র : দৈনিক একাত্তরের কথা

